ঢাকা, বুধবার   ১৮ মার্চ ২০২৬

এক পশলা আনন্দ ‘ঈদ সালামি’র ইতিহাস-ঐতিহ্য

মানিক শিকদার

প্রকাশিত : ১৪:০৬, ১৮ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৪:১২, ১৮ মার্চ ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে কোনো কিছুই কারো দৃষ্টি এড়ায় না। প্রতিদিন নানা বিষয় উঠে আসছে মোবাইল স্ক্রিনে। আর একদিন বাদে শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলেই ঈদুল ফিতর। কয়েকদিন ধরে ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে সালামির রেট কার্ড। এরই মধ্যে মেসেঞ্জার হোয়াটসআপ গ্রুপে আসছে সালামির নানা দাবি। 

সালামি নিয়ে মজা উচ্ছ্বাস আর মধুর যন্ত্রণায় মুখর বদ্ধু-সহকর্মী পরিবারের ছোট-বড় অনেকেই!

ঈদের অনাবিল আনন্দের অবিচ্ছেদ্য একটি অনুষঙ্গ হলো ‘ঈদ সালামি’। ছোটবেলায় নতুন জামার খচখচে শব্দ আর ঈদের সেমাইয়ের সুবাসের চেয়েও যা বেশি রোমাঞ্চ জাগাত, তা হলো বড়দের কাছ থেকে পাওয়া সেই কড়কড়ে নতুন নোটগুলো। এটি কেবল কিছু নগদ অর্থ নয়, বরং এর সাথে মিশে থাকে আশীর্বাদ, ভালোবাসা এবং শৈশবের অমলিন স্মৃতি।

সহজ কথায়, ঈদের দিন ছোটরা বড়দের কদমবুসি বা সালাম করার পর বড়রা স্নেহের নিদর্শন হিসেবে ছোটদের যে উপহার বা অর্থ প্রদান করেন, তাকেই ‘সালামি’ বা ‘ঈদি’ বলা হয়। এটি মূলত একটি সামাজিক রীতি যা আনন্দ ভাগাভাগি করার এক সুন্দর মাধ্যম। সালামি দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত নতুন নোটের কদর বেশি থাকে, যা উৎসবের নতুনত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

ঈদ সালামির ইতিহাস ও উৎপত্তি
ঈদ সালামির শেকড় খুঁজতে গেলে আমাদের তাকাতে হবে মধ্যপ্রাচ্য ও মোগল আমলের দিকে। যদিও এটি মূলত একটি ধর্মীয় উৎসবকেন্দ্রিক প্রথা, এর বিবর্তন ঘটেছে শত শত বছর ধরে।

ইতিহাসবিদদের মতে, সালামির ধারণাটি প্রথম শুরু হয় ফাতিমীয় খিলাফতের সময় (দশম শতাব্দীতে)। তৎকালীন মিশরে ঈদের দিন খলিফারা প্রজাদের মধ্যে মুদ্রা, পোশাক এবং মিষ্টি বিতরণ করতেন। একে বলা হতো ‘ঈদিয়া’। অটোমান সাম্রাজ্যের সময়ও সুলতানরা বিশেষ ভোজের পাশাপাশি মুদ্রার থলি বিলি করতেন।

ভারতীয় উপমহাদেশে সালামির প্রচলন ব্যাপকতা পায় মোগল আমলে। মোগল সম্রাটরা ঈদের দিন দরবারের সভাসদ এবং সাধারণ প্রজাদের মধ্যে স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রা বিতরণ করতেন। তখন এটি ছিল রাজকীয় বদান্যতার প্রতীক। কালক্রমে রাজদরবারের এই প্রথা সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে যায় এবং তা পারিবারিক বন্ধনের একটি অংশে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে ঈদ সালামি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং একটি আবেগের নাম। গ্রামীণ জনপদ থেকে শুরু করে শহুরে যান্ত্রিক জীবন—সর্বত্রই এর জয়জয়কার।

শিশুদের জন্য ঈদের মূল আকর্ষণই হলো সালামি। কে কার কাছ থেকে কত টাকা পেল, কার জমানো টাকা সবচেয়ে বেশি হলো—এ নিয়ে ভাইবোন ও বন্ধুদের মধ্যে চলে মিষ্টি প্রতিযোগিতা। মা-বাবার দেওয়া নতুন জামার পকেটে পরম যত্নে সেই টাকা জমিয়ে রাখা এক পরম সুখের অনুভূতি।

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বড়দের শ্রদ্ধা জানানো একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা। ঈদের দিন সকালে ঈদের নামাজ শেষে বাড়িতে এসে ছোটরা যখন বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করে, তখন বড়রা দোয়া করার পাশাপাশি সাধ্যমতো অর্থ হাতে তুলে দেন। এটি কেবল বিনিময় নয়, বরং বড়দের প্রতি ছোটদের সম্মান এবং ছোটদের প্রতি বড়দের স্নেহের এক চমৎকার প্রতিফলন।

সালামি দেওয়ার রেওয়াজ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রতিবছর একটি বিশেষ প্রভাব ফেলে। ঈদের আগে ব্যাংকগুলোতে নতুন নোট সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছাড়ে কেবল এই চাহিদা মেটানোর জন্য। সালামির সেই টাকা দিয়ে মেলা থেকে খেলনা কেনা, আইসক্রিম খাওয়া কিংবা মাটির ব্যাংকে টাকা জমানোর মধ্য দিয়ে শিশুদের মধ্যে সঞ্চয় ও ব্যয়ের প্রাথমিক ধারণা তৈরি হয়।

সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশে সালামি দেওয়ার পদ্ধতিতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। একসময় কেবল দুই টাকা, পাঁচ টাকা বা দশ টাকার নোটের আধিপত্য ছিল, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে বড় অংকের নোট। বর্তমানে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যুক্ত হয়েছে 'ডিজিটাল সালামি'। যারা সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেন না, তারা এখন বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে দূরপ্রান্ত থেকে সালামি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি অনেক সময় মেসেজে সুন্দর সুন্দর গ্রাফিক্স কার্ডের মাধ্যমেও ডিজিটাল সালামি বিনিময় হচ্ছে।

সালামি প্রথাটি সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ

এটি শিশুদের মনে ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে দেওয়ার বা ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করে। অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কোনো মান-অভিমান থাকলেও সালামি লেনদেনের হাসি-তামাশার মধ্য দিয়ে তা কেটে যায়। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসা একটি পরম্পরা, যা আমাদের বাঙালিয়ানা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধনকে টিকিয়ে রেখেছে।

ঈদ সালামি কেবল কাগুজে নোটের আদান-প্রদান নয়; এটি হলো উৎসবের রঙে মন রাঙানোর একটি চাবিকাঠি। যদিও সময়ের সাথে সাথে সালামি দেওয়ার ধরন বদলেছে, টাকার অংক বেড়েছে, তবুও সেই কড়কড়ে নোট পাওয়ার আনন্দ আজও আগের মতোই অমলিন। বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে ঈদ সালামি যেন এক টুকরো সুখের বৃষ্টি হয়ে আসুক, যেখানে বড়দের দোয়া আশীর্বাদ আর ছোটদের অমায়িক হাসি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে।

এএইচ


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি